কক

ঐতিহ্য ও জীবিকার মেলবন্ধন দেশের সর্ববৃহৎ নেছারাবাদ ভাসমান কাঠের বাজার


 

ঐতিহ্য ও জীবিকার মেলবন্ধন দেশের সর্ববৃহৎ নেছারাবাদ ভাসমান কাঠের বাজার

সুমন দেবনাথ, বানারীপাড়া (বরিশাল) প্রতিনিধি

পিরোজপুরের নেছারাবাদ (স্বরূপকাঠি) উপজেলার কয়েকটি চরে একসময় সুন্দরী কাঠ ও গোলপাতাকে কেন্দ্র করে দেশের সর্ববৃহৎ ভাসমান বাজার গড়ে উঠেছিল। সন্ধ্যা নদীর তীরবর্তী এসব চরজুড়ে চলত গোলপাতা ও সুন্দরী কাঠের রমরমা বেচাকেনা। তবে সময়ের সঙ্গে সুন্দরী কাঠের দুষ্প্রাপ্যতা এবং গোলপাতার ব্যবহার কমে যাওয়ায় থমকে পড়ে সেই ঐতিহ্যবাহী ভাসমান বাজারের পূর্বের চিত্র। এরপর শুরু হয় দেশীয় কাঠের ভাসমান বাজারের যাত্রা।

শতবর্ষী কাঠ বেচাকেনার ঐতিহ্য

এই ভাসমান কাঠবাজারের ইতিহাস শত বছরেরও বেশি সময়ের। একসময় সুন্দরী কাঠকে কেন্দ্র করে এই অঞ্চলের মানুষের প্রধান জীবিকা ছিল এ ব্যবসা। ১৯১৭ সালের দিকে সুন্দরবনের সুন্দরী কাঠ নিয়ে এখানে ব্যবসা শুরু হয় এবং ১৯১৮ সালেই সন্ধ্যা নদীর শাখা খালে গড়ে ওঠে ভাসমান কাঠের হাট।

সুন্দরী কাঠে সরকারি নিষেধাজ্ঞা আসার পর নেছারাবাদে গড়ে ওঠে মেহগনি, রেইনট্রি, চম্পলসহ নানা দেশীয় কাঠের মোকাম। বর্তমানে নেছারাবাদের বিভিন্ন খাল, মোহনা ও চরঘেঁষা স্থানে গড়ে উঠা এসব ভাসমান বাজার দক্ষিণাঞ্চলের সবচেয়ে বড় কাঠের ব্যবসাকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।

১০ হাজার মানুষের জীবিকার উৎস

ব্যবসায়ী, শ্রমিক, নৌকার মাঝি–মাল্লাসহ প্রায় ১০ হাজার মানুষ এ কাঠবাজারকে কেন্দ্র করে জীবিকা নির্বাহ করেন। প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ব্যবসায়ীরা কোটি টাকার কাঠ ক্রয় করে ট্রাক, লঞ্চ, কার্গোসহ বিভিন্ন পরিবহনে নিয়ে যান নিজ নিজ মোকামে।

হাটবারে বেচাকেনার পরিমাণ আরও বেড়ে যায়—প্রতিদিন কোটি টাকার বেশি কাঠ হাতবদল হয়। কাঠের সহজলভ্যতার কারণে এ অঞ্চলে ক্রিকেট ব্যাট ও ফার্নিচার শিল্পও গড়ে উঠেছে, যা হাজারো মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করেছে।

ব্যবসায় সংকট—রাজনীতি, পরিবহন, দালালচক্র

  • পরিবহন সংকট
  • রাজনৈতিক প্রভাব
  • স্বল্পলভ্য ব্যাংকিং সুবিধা
  • দালালচক্রের উৎপাত
  • নদীপথে জলদস্যুদের হামলা
  • প্রাকৃতিক দুর্যোগে বৈধ কাঠের সরবরাহ কমে যাওয়া
  • পাইকারি ক্রেতার অভাব

এসব কারণে কাঠ ব্যবসা টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেকে ঋণ নিয়ে ব্যবসায় নেমে ক্ষতির মুখে পড়ায় বড় সংকটে রয়েছেন।

একজন ব্যবসায়ী বলেন, “একটি গাছ ব্যবহারের আগে ৫-৬ বার হাতবদল হয়। দাঁড়ানো গাছ কাটার পর থেকে বাজারে বিক্রি পর্যন্ত ৮ ধরনের শ্রমিক কাজ করে।”

একজন আড়তদার বলেন, “বাংলাদেশের সব জেলার ব্যবসায়ীরাই এখানে কাঠ কিনতে আসেন। এটি শত বছরের পুরোনো ব্যবসার কেন্দ্র।”

ঋণের চাপে রাতেও ঘুম নেই

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন যুবক ব্যবসায়ী জানান, “ঋণ নিয়ে ব্যবসা করছি। কাঠ বিক্রি না হওয়ায় ব্যাংক ও এনজিওর কিস্তির চাপে রাতেও ঘুমাতে পারছি না। সরকার যদি স্বল্পসুদে ঋণের ব্যবস্থা করত, তাহলে ব্যবসায় টিকে থাকতে পারতাম।”

ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত—তবু টিকে আছে ঐতিহ্য

নেছারাবাদ কাঠবাজার দেশের ৬৪ জেলার সঙ্গে যোগাযোগ রেখে দেশের সবচেয়ে বড় কাঠ সরবরাহ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। কাঠ বহনকারী নৌকাগুলো জলদস্যুর আশঙ্কা এড়াতে ২৫–৩০টি নৌকার বহরে একসঙ্গে আসে এবং একসঙ্গে ফিরে যায়।

নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও শতবর্ষী এই ভাসমান কাঠবাজার এখনো দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ এবং হাজারো মানুষের জীবিকার প্রধান ভিত্তি।

Comments